সৈয়দ স্যার স্কুলের হেড টিচার । লম্বা, শুকনো, হাসতে না জানা সাদা পান্জাবী পাজামা পরা মানুষটা, কিন্ত অত্যন্ত দৃঢ়চেতা একটা ভাব ফুটে থাকতো অবয়বে । এমনটা আমি কখনো দেখিনি আর । শুভ্র শশ্রুমন্ডিত নুরু পন্ডিত স্যার, বার্ষিক স্যার, কালো কোলো সদা হাস্য হুজুর স্যার আর লম্বা সুন্দর হুজুর স্যারের উপর তার সাবলীল প্রভাব দারুন স্বস্থিদায়ক একটা পারিবারিক আবহ ছড়িয়ে দিতো স্কুলের সমগ্র বলয়ে । এই ছিলো চরশুভী ফ্রি প্রাইমারী স্কুল, আমাদের ‘বোড স্কুল’ । স্কুলের পাশ দিয়ে লম্বালম্বি একটা রাস্তা চলে গেছে চরখলিফা মাদ্রাসার সামনে দিয়ে মাঝির হাটের দিকে, কিন্তু ঐ রাস্তাটা আমরা ব্যবহার করেছি খুবই কম । বাজার থেকে কাচারীর সামনে দিয়ে ধানক্ষেতের আলে আলে সোজা স্কুলের পুকুর পার । লম্বা টিনের তৈরী স্কুল ঘরে লাইব্রেরীর সামনে দিয়ে স্কুল বারান্দা ধরে আমাদের ক্লাশরুমে পৌঁছে যেতাম । ক্লাশ ফোর । আমার প্রথম ক্লাশ । এর আগেও স্কুলে গিয়েছি, তবে সেটা ছিলো আপার স্কুল, দৌলৎখাঁ গার্লস প্রাইমারী স্কুল । গফুর মিয়ার পুরোনো নুনের কারখানায় ছিলো স্কুলটা । আপার সাথে যেতাম, তবে পড়ার টানে না, স্কুলের গানের টিচার ‘বোরকা মাষ্টার’ আর থানার বড় দারোগার শ্যালক অরবিন্দ’দার জন্য । ক্লাশ শেষে, কখনো বা ক্লাশ বন্ধ রেখেই বোরকা মাষ্টার টেবিলে হারমোনিয়াম রেখে, তা বাঁজিয়ে মেয়েদেরকে গানের প্রাকটিশ করাতেন । ছোটখাটো টিংটিঙে কালো গানের স্যারের বোরকা (পোকায় খাওয়া) দাঁতের হাসি আর হাটুয়া ধূতি দেখতে ভারী মজা লাগতো আমার । টেবিলের সামনে লাইন কর দাড়াতেন আপারা, খুকু আপা, নাজু আপা, অঞ্জলী দিদি … । ‘মূক্তির মন্দির সোপাণ তলে’, আর ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, গান দুটোই বেশী শেখানো হতো । ঐ স্কুলের হেড টিচার খালেক স্যারও (আমার সম্পর্কিত মামাও) প্রায়ই জয়েন করতেন গানের ক্লাশে ।
আর অরবিন্দ’দা শোনাতেন গল্প, রূপকথার । মাষ্টারের মতো টেবিলের পেছনের চেয়ারে বসতেন, আমরা বসে যেতাম তার তিনপাশ ঘিরে, হাই-বেঞ্চ, লো-বেঞ্চ এবং টিনের বেড়ার জানালায়।
অক্ষর জ্ঞান কিভাবে হয়েছিল মনে পড়েনা , তবে দস্যু মোহন, দস্যু বাহরাম আর টেক্সীর ড্রাইভার টাইপের বইয়ের পোকা ছিলাম । অবশ্য বইগুলির মূল পাঠক ছিলেন আমার আপা, আমি নিতাম সাবলেট । আমার স্কুলে (চরশুভী) ভর্তির আগের কথা এগুলো । আমিতো স্কুলে প্রথম ভর্তিই হয়েছি ক্লাশ ফোরে ।
এমন দিনেই পাকিস্তান-হিন্দুস্থানের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো কাশ্মীর নিয়ে । স্কুলের ফাংশানগুলিতে আজাদ কাশ্মীর নিয়ে জারী আর কোমরে টিনের তলোয়ার ঝুলিয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়াটা জবরদস্ত আনন্দের ব্যাপার হয়ে দাড়ালো আমাদের মতো শিশুদের কাছে । তখন প্রায় সাত বৎসর বয়স আমার ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন